Tuesday, May 08, 2018

লেখার ইতিহাস



নিকান্দুনির চোখের জল লাগবে লক্ষ্মণ কে বাঁচাতে। নিকান্দুনি নিকষা কোথায়? হাইছ! বাল্মীকির কি সাধ্য ছিল ঘরের হাইছ এ নিকষা কে বসিয়ে রাখে? এই সাফল্য বাংলার রামায়ন গাতকের। লিখিত পৃথিবীর ইতিহাসে কে কখন শর্তারোপ করেছে, যে নিকষা লংকাপুরীর সাজানো কিচেনে বসে পানের বাটা থেকে পান নেয়া অবস্থায় হনুমান আক্রান্ত হবেন? পশ্চিম আফ্রিকার মান্ডিদের মধ্যেও সেই একই আচার। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিনের বংশধরের গুনগান আফ্রিকান মান্ডি আর রঘুবংশের গান করা বাংলার গাতকের মধ্যে ভাবে, কর্মে, রসে খুব পার্থক্য নেই।

বইয়ের রিভিউ তে ফেরা যাক। এই বইটার গুড রিডস রিভিউ তে একজন এক তারা দিয়েছেন। আমি দিয়েছি পাঁচ। কারণ ইংরেজী পড়তে আমার অনেক কষ্ট হয়, এত কষ্ট করে পড়েছি, আমার পড়াকেই পাঁচ তারা (আসলে কষ্ট হলে পড়ে শেষ করতে পারতাম না)। যিনি একতারা দিয়েছেন, তার রিভিউ তে উনি যে কারণে বইটা পড়তে পারেন নি সেটার উল্লেখ করেছেন, এমন আমারও হয়। অরওয়েলের এনিম্যাল ফার্মও আমি একসময় পড়তে পারিনি। ধৈর্যশক্তি বাড়ার পরে পেরেছি। যাই হোক। ভারতীয় ব্রাহ্মী লিপির উদ্ভব কবে থেকে এরকম একটা ব্যাপারে লেখকের উল্লেখ নিয়ে রিভিউয়ারের আপত্তি। আমি উইকিপিডিয়া থেকে মেলালাম। খুব বেশি আপত্তি করলাম না, যদিও আমিও খানিকটা চমকে গিয়েছিলাম।

আর কি? লেখকের নিজস্ব ভ্রমণ সাহিত্যের ইতিহাসে। খানিকটা ভূগোল। খুব অবাক লাগে মাঝে মাঝে, পৃথিবীটা কেন গোল হলো সেটা ভেবে। ঘূর্ণনের জটিল বা সরল ব্যাখ্যা তো আছেই। এই যে নানান দিকে মানুষ আছে, তাদের একটা সমতল পাতের দুই দিকে বা কিউবের ছয় দিকে রেখে ঠিক যেন সাম্যাবস্থা হয় না। কিসব বলছি! বইটা পড়েন।   

Monday, April 30, 2018

সাধুসঙ্গ

ইহা একটি ফটোব্লগ, কথা কম, ছবি বেশি!
ইদ্রাকপুর কেল্লার ভিতরে। মুন্সিগঞ্জ সদর। গুলিস্তান থেকে দীঘির পাড়ের বাসে উঠে, সদর, সেখান থেকে অটো করে ৫-১০ টাকায় পুরান কাচারি। দেয়াল উচু, গেট বন্ধ।অগত্যা বেয়ে পার হয়ে যেতে হলো।
ইদ্রাকপুর কেল্লার সিড়ি। তেমন কিছু নেই, একটা সুরঙ্গ মতন আছে, এই আর কি! কোন এক কালে নদী পাহারা দেয়ার জন্য তৈরী। এখন উপর থেকে আর নদী দেখা যায় না। মোক্তারপুর ব্রিজ পার হবার সময় অসংখ্য চিমনি দেখা যায় রাইস মিলগুলির। বাংলায় ধান সিদ্ধ করার কল। 



দীঘির পাড়ের বাস থেকে ভালো সমাধান, ট্রেন বা বাসে চাষাড়া বা ফতুল্লা গিয়ে, সেখান থেকে সিএনজি নেয়া। সময় বাঁচবে, টাকা একটু বেশি খরচ হবে। মুশকিল হল গেন্ডারিয়া থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত বাস রাস্তা এপ্রিল ২০১৮, এই সময়ে জঘন্য ছিল। আমরা মুন্সিগঞ্জ ঘাটে, পোয়ামাছ আর গরুর মাংস দিয়ে দারুন খাওয়া দাওয়া করেছিলাম, দেখলাম ভালোই সময় আছে, মোক্তারপুর ব্রিজ থেকে রিজার্ভ অটো নিলাম, প্রথম বজ্রযোগিনী, এর পরে সিরাজদীখান, ৩৫০ টাকা চাইলো। এই ছবিটা অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের জন্মভিটায়। সেখানে এক ভিক্ষু সন্ধান দিলেন, বিক্রমপুরী বৌদ্ধ বিহার দেখে যেতে।
বিক্রমপুরী বৌদ্ধ বিহার, বজ্রযোগিনী গ্রাম। দারুন সে গ্রাম, মাছরাঙ্গা, ভুট্টা, শসা ক্ষেতে দেখে দেখে পৌছে গেলাম সেখানে, অল্প ধ্বংসাবশেষ আছে। সংস্কার করা হয়েছে, জাবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাজ।

এটা এমনি, বসার জায়গা। নতুন করে একটা ঘর বানানো আছে, এগুলি মনে হয় দর্শনার্থীদের জন্য। 

সিরাজদীখান বাজারে মিষ্টি দারুন। মা ক্ষীর ভান্ডার! সেখান থেকে অটো নিয়ে রামানন্দ গোরস্তান। তার পাশ দিয়ে ক্ষেতের আইল ধরে এই ঘাটে। পদ্মহেমের ঘাট। আইসা পড়ছি। কি দারুন শান্তির জায়গা।
তিলের ক্ষেত, পদ্মহেমের পাশে। আমি শুরুতে ভেবেছিলাম কালিজিরা। একটা দুইতলা কাঠের ঘর, মুন্সীগঞ্জের সমগ্র এলাকার বৈশিষ্ট্য বোধ করি। ক্ষেতের ঐপারে একটা মসজিদ আছে।

আখড়ার উপরে এমন কৃষ্ণচূড়া, প্রকৃত চূড়াই। আমরা ততক্ষণে অধিবাস অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। বাউল তরিকার ব্যাপার স্যাপার, বৈষ্ণবদের সাথে মিল আছে, এখানকার প্রবীন গুরু নিরামিষ ভোজী, বেশ!

মেলার মাঠে। আমরা এসে বেশ একটা সাঁতার দিলাম, পাশের নদীর অল্প জলে। জল স্বচ্ছ, শীতল, কাঁদা একটু কম আর জল আরো বেশি হলে, আনন্দ অনেক গুণ হতো, তবু যাই হলো তা কম নয়, দুয়েক জায়গায় গলা জল, অঠাঁইও পাওয়া গেল। 

সূর্যাস্তের সময়। আমরা বেশ খানিক সময় এখানে বসেই কাটালাম দীপুর অপেক্ষায়। এর মধ্যে ঢাকা থেকে আসা তরুনেরা, যারা ঠিক বাউল তরিকার না, আবার আমাদের মতন শুধু ঘুরতে আসেনি, এরা গিটার বাঁশি সহযোগে বাদ্য বাজনা করলো। সুন্দর পরিবেশ বাদ্য বাজনার জন্য। আযান শুরু হইতে, মেলা থেকে কয়েকজন বোরকা পড়া মহিলা এসে বাদ্য-বাজনা আযানের দোহাইয়ে থামাইতে বললেন।

মাঠখানা।খুবই সুন্দর তার ঘাস। সন্ধার পরে ভেবেছিলাম, এখানেই বসে থাকা যাবে। তা হয়নি, প্রচন্ড শিশির পরে, সব ভিজে একাকার। 

সন্ধ্যার গান আরম্ভ হলো। শুরু করলেন প্রবীন গুরু।একে একে অন্যরা, মাঝে শফি মন্ডল, শেষে আনন্দনগর। সাউন্ড সিস্টেম কিছু গোলমাল ছিল, আর ভয়ানক উপস্থাপিকা, ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, বিকেলে অধিবাসের সময়ও ছিলেন। 

আনন্দনগর যতক্ষণে গাইতে আরম্ভ করেছে,ততক্ষণে আমরা মঞ্চে, গান গাইতে নয়। বটগাছে হেলান দিতে। শফি মন্ডল আর আনন্দনগর মোটামুটি পচা সাউন্ড সিস্টেম একটু ঠিক ঠাক করে নিয়েছিল। আনন্দনগর হলো জলের গান থেকে রাহুল আনন্দ কে বাদ দিয়ে সাথে কবির হোসেন ফাউ। খমক, দোতারা আর ভোকার ভালৈ।  

সকালে পায়ে হেটে বালুচর। সেখান থেকে ট্রলারে ফতুল্লা। রাতের বাদশাহ ভোগ আর ক্ষীরসার পরে ভোর রাতে খিচুরী সেবা। সকালে কি আনন্দে বাইর হইলাম, আহা, অল্প একটু ঘুমও হয়েছিল।

ট্রলারে ফতুল্লা। অনেক গুলি ইন্টার পরিক্ষার্থী ছিল। বাংলাদেশের ইতিহাস - এই ধরণের একটা পরীক্ষা হবে।

আহার, মস্তক ও কর্ণ। রাতে যেখানে ঘুম হইল। 

Saturday, April 14, 2018

কোথাও কোন পরিবর্তন নেই আর


তিন

ফিলিপিনী ক্রীতদাসী
পাললিক গৃহবধু ব’নে।
স্বর্ণ-তোরণ সেতু
সবুজ সেতু – ব্রিসবেন নদী
কোন কিছু রইবে না টিকে তার
এক মিশরীয় পিরামিড চূড়া
ধূসর বালুর নিচে, রাশমোর পর্বত
কৃষ্ণকায় কয়লার স্তূপ;
যত মানব সৃষ্ট আকর
পূর্বী নদীতে ধ্বসে যাবার আগে-
সৈকতের জলের বালুর মতো ধুয়ে যাবে,
শামীয়-রোমক-য়্যুরোপীয় শৌর্য-শির।


এই এক আক্ষেপ
‘হায়’ প্রশান্ত জলাশয়!
ছোট ছোট গুচ্ছগ্রাম, আরণ্যক প্রশান্তি
বিস্তীর্ণ মরুর বুকে
আমার পূর্বপুরুষের বসতি
শিকার আর ঘুম বাদে, মাতাল ঘুম
এর বাদে শিখে নাই কিছু-চাষবাস।
নৌকার গলুই-সাতঁরে মহাদেশ
জানেনা সেসব কবেকার-
শুধু জানে, স্বপ্নের মাঝে ডাকে তারে সমুদ্র
বলে “ফিরে আয়”, লোনা জল মেখে ঘেমে ফিরে আসে
নিজের বিছানায়, বালিশের কাছে একটু ভেজা-
কোথাও কোন পরিবর্তন নেই আর।


সুপার মার্কেট ফেরত গৃহবধু
ওজন কমাতে দৌড়োচ্ছে প্রতিদিন
উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব মাঠের চারিধার।
প্রেমিকার লিপস্টিক মুছে গেলে ভাবে
‘ঐ বুঝি দেখে কেউ’!
এখানে থামতে হবে-
নয়ত শনিবার বিকেলে পাব-রেস্তোরা থেকে
সোজা বেডরুমে-
ছাড়, খ্রিস্টিয় জন্মদিনের ছাড়।



চার 



বেণুবনে একা কাঁদে হাঁস, শামুকের
শ্বাসরোধ হয়, ধ্রুব সাঁতরাচ্ছিলেন
একা- লোকায়ত/লোকোত্তরে,
পরামিলে সাংখ্যজাতিকা, ঐশ্বরিক
ঈর্ষাবায়ুর হলকায় দ্বীপান্তরে
যাচ্ছে পুড়ে কুটিরশিল্প সংগ্রহশালা!



ধীবর অঙ্গে আঁকা হলো ব্যাসরেখা
বোর্হেসের গ্রন্থাগারে আঁতি-পাতি
আগে-পরে ব্যাখ্যা হাজার, গোলাপের
নাম খুন, পাথর বিবর্তনে হয়
কাঠ, ডিম ভেঙ্গে তেড়ে আসে
প্লাটিপাস, নির্ভার মায়ের কোল-
তুই দিবি দুর্গা? কাফের তবে
সন্ধান করুক মুসলমানের লাশ!



শ্রীকৃষ্ণ নাকি হলধর? এই করে
কাটালে শৈশব, সহস্র-ফণা-নাগ আর
মৃগয়া ভ্রমে শর বিঁধে মরলো মানুষ।
পালাবে কোথায়? ফেরাও, তোমাতেই
অহল্যার সমূহ সর্বনাশ, লেজ ধরে
পার হবে পুলসিরাত/বৈতরণী?
উপনিষদে গাভী ছিল। ণ-ত্ব বিধান
অপেক্ষা শ্রেয় জিহবা আর নাভীমূলে
উচ্চারণ! মহৎ সে কিতাবের সারাংশে
ভুল নেই, আছে মানুষের কথা
ভেড়া আর ঈগলের উপাখ্যান, আর
যত স্বৈরাচারী শালিকের জয়গান।



মা গো, তুমি ই তো বলেছিলে
আমার মৃত্যু হবে না, তবে কেন
গঙ্গায় ছুঁড়ে দিলে? আমি তো
জানিনা সাঁতার।ডুব দেবো, মুক্তাপরীর
দেশে যাবো, ঝিনুকের বুকে
হবো বালির অন্তরাল, কেঁদো না।

Wednesday, July 19, 2017

জীবমিথু

সকাল থেকেই বেশ একটা অনুভূতি টের পেলাম। কিন্তু কোন একটা নাম দিতে পারছি না। বেশ একটা বিষাদ, কিন্তু পুরোপুরি বিষাদ না, বিষাদের মধ্যেই কেমন নির্লিপ্তি এসে জুড়েছে। এইটুকু বলাও যথেষ্ট হলো না। আমি কিন্তু জোর দিচ্ছি ঘুম থেক উঠার পর, দিনের শুরুর, ঠিক দশটা সাইত্রিশ মিনিট বিশ সেকেন্ডের দিকে শুরু হওয়া অনুভূতিটার দিকে। এমন না যে জোর করে গত ঘণ্টা দুয়েকের অনুভূতির সারাংশ করছি। সময় টার কথা বললাম ভয়ে ভয়ে, শব্দপ্রত্নের লোকেরা খুঁজে বের করবে, গত রাতে ঘুমোতে দেরি হবার কথা, তারপর সেটার থেকে বিষাদ, নির্লিপ্তির সাথে ক্লান্তিও জুড়ে দিতে পারে। সমারূঢ় অধ্যাপকেরা। "বিষাদের মধ্যেই ... নির্লিপ্তি" - এর কি মানে? এই যে শব্দগুলি, এরা আগে থেকেই বেশ কিছু মানে নিয়ে আছে, সেগুলির সাথে মিলিয়ে কি ঠিক ঠাক বোঝা যাচ্ছে? আরো কিছু শব্দের সাহায্য নেয়া যায়, বেশ একটা কর্মচাঞ্চল্যও আছে, সিসিফাসও চলে আসছে বিষাদের সাথে তবে প্রবল নয়। বরং পাহাড়ে উঠতে শুরু করে যে নির্লিপ্তি, তেমন হয়ত। এখন আমি আরো অনেকগুলি শব্দও ব্যাবহার করে ফেলেছি। হয়ত আরো একচল্লিশ হাজার শব্দ ব্যাবহার করে একটা পুঁথিও তৈরি করে ফেলা যাবে, এখনকার শব্দগুলিকে নিয়ে, যেগুলি আমি প্রায়ই ব্যাবহার করি, কিন্তু বিশ্বাস করেন, তাতে এই অনুভূতিটার প্রতি অন্যায়ই হবে। এ যে একেবারে অনন্য, অন্তত অভুতপূর্ব এই হৃদয়ের কাছে। পাল্টা প্রশ্ন হতে পারে, নাম দেয়ারই বা কি দরকার? এই জায়গাটায় এসে অনুভূতি টা একটু ফিকে হয়ে যায়, চুড়ার সিসিফাসের বিষাদ আক্রান্ত করতে চায়, তাই এই প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যাই। যা হোক। আপনাদের বেশি সময় নিয়ে ফেলছি, একটা নাম প্রস্তাব করিঃ এই অনুভূতিটার নাম দিলাম, "জীবমিথু" ভাব। এখন, আরেকটা পুরাতন সমস্যা, "জীবমিথু" শব্দটিকে আপনাদের মধ্যে চালাতে হলে, ঐ বিষাদ, নির্লিপ্তি, ক্লান্তি এবং এরকম আরো অনেকগুলি বিশেষ্য, ক্রিয়া, সর্বনাম, অব্যয়ের সাহায্য প্রয়োজন হবে। "জীবমিথু" হয়ত তখন আপনাদের পরিচিত কোন অনুভূতি হিসেবে মূর্ত হবে। হয়ত হবে না।

Thursday, May 18, 2017

World of Yesterday / Stefan Zweig


"রয়্যাল গেম" যখন প্রথম পড়েছিলাম তখন জানতাম না যে ওটা ছিল স্তেফান সোয়েইগের শেষ লেখা। একটা গল্পে কতটুকুই বা জানা যায়? মিখাইল তালের জীবনী খুব টেনেছিল, দাবা খেলার ইতিহাস ও খেলাটাকে ভালো লাগে, তার সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি মিলে অত্যন্ত সুখপাঠ্য ছিল "রয়্যাল গেম"। এর পর? এর পর রবীন্দ্রনাথ এর ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনী পড়তে পরতে পেয়ে গেলাম রোমা রল্যার খোঁজ। স্তেফান সোয়েইগ আস্ত একখান বই লিখেছেন রল্যাকে নিয়ে, ইউরোপের শ্রেষ্ঠ চিন্তক মনে করতেন তাকে। 
শুরু করলাম, সোয়েইগের আত্মজীবনী "ওয়ার্ল্ড অফ ইয়েস্টারডে" ইংরেজি অনুবাদে। এখানে ব্যাক্তি সোয়েইগের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। সবটাই লেখক সোয়েইগ। শুরু করেছেন, সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শান্তিময় দিনগুলিতে। স্কুলে তখন ফ্যাশন ছিল কিছু একটা নিয়ে মেতে থাকার। দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের নায়কেরা যেমন পিতার্সবুরগের রাস্তায় একেকজন দর্শন বা মতবাদ দিয়ে যাচ্ছেন, ভিয়েনার আবহাওয়ায় তখন দারুণ ফ্যাশন। সোয়েইগের সহপাঠীরা ব্যস্ত কবিতা নিয়ে। সেই থেকেই শুরু।
যে যুগের কথা বলছেন, সেটি যেন বড়োদের বা বুড়োদের যুগ। ছোটোরাও কত দ্রুত বড় হওয়া যায় তাই নিয়ে ব্যাস্ত। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আসছে কীভাবে দ্রুত দাঁড়ি গজানো যায়। ব্রিফকেস নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে তরুণেরা যাতে তাদের বড়ো বা পরিণত দেখায়। ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার বাঁধ চারিদিকে। ঠিক সেসময় কি পড়ছেন সোয়েইগ ও তার বন্ধুরা? রিলকে, নীটশে, কিয়েরকেগার্দ, যেখানে যা পাচ্ছেন বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে পড়ে চলেছেন। শিক্ষকেরা? সোয়েইগের মতে, ভিয়েনার স্কুলগুলির ছিল পাঠ্যক্রমের গর্ব। যেন সর্বোচ্চ উৎকৃষ্ট পাঠ্যক্রম তৈরি আর তার মধ্যও দিয়ে বের হয়ে আসবে শ্রেষ্ঠ ও বাধ্যগত একটা তরুণ প্রজন্ম, বুড়োরা তাই চাইতেন। সোয়েইগের শিক্ষকেরা কোনোদিন তার বা তার অন্যয়ও সহপাঠীদের মনের ঠিকানা জানতেন না। স্কুলে থাকতেই "অচল" শিক্ষকদের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে গিয়েছিল এই তরুণ প্রজন্ম।
পুরো বইটা তো আর সারমর্ম করা যাবে না এখানে। সোয়েইগের লেখক জীবন, উত্থান সাফল্য বন্ধুত্ব, তার মাঝে চমৎকার ভাবে এসেছে রল্যা, ভ্যারহারে, রিলকের সাথে তার বন্ধুত্বের স্মৃতি- জয়েস, রোঁঁদ্যা, দালি, স্ট্রস, ফ্রয়েড। শুরুতে নিজেই প্রচুর অনুবাদ করতেন, পরে জীবদ্দশায় সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনুদিত লেখক।
সোয়েইগ লন্ডনে তার সাথে ইয়েটস এর দেখা হবার বর্ণনা দিচ্ছেন। একটা কবিতা পাঠের আসর। একটা জনাকীর্ন ছোট ঘরে, অন্য সব বাতি নেভানো। কালো একটা পড়ার টেবিল বা ডেস্ক। তাতে দুইটা বড় বড় সুগন্ধি মোমবাতি জ্বালানো। ইয়েটস পড়া শুরু করলেন। সোয়েইগের মনে হলো যেন একজন সাধু-সন্ত কবিতা পাঠ করছেন, লোকজন চেয়ারে এমনকি মাটিতে বসেও শুনছে । তার মনে পড়লো সরল, সহজ ও নিঃস্পৃহ ভঙ্গিতে রিলকে বা ভ্যারহারের কবিতা পাঠের স্মৃতি। সোয়েইগের ভাষায়, "...in spite of my love for his work I was somewhat distrustful of this cult treatment."
সোয়েইগের নাট্যভাগ্য খুবই মরবিড। প্রথম নাটক গ্রীক মিথলজির উপর, ট্র‍্যাজেডি। আর তাতে এক গ্রীক বীরের চরিত্র করতে চাইলেন, ততকালীন জার্মান রাইখের শ্রেষ্ঠ অভিনেতার একজন, ম্যাটকোভস্কি। দুর্ভাগ্য সোয়েইগের বা ম্যাটকোভস্কির, রিহার্সেল শুরু হবার পর অভিনেতা মারা গেলে বার্লিন থিয়েটারের নাটকটি আর নামে নি। একই নাটকে এর পর অন্য প্রধান চরিত্র করতে চাইলেন যোসেফ কাইঞ্জ, ভিয়েনিজ থিয়েটারের সুপার স্টার। এমনকি সোয়েইগকে তার জন্য একটা একাঙ্কিকা লিখতেও বললেন। ভিয়েনার প্রসিদ্ধ বুর্গথিয়েটারে মঞ্চস্থ হবে। সবকিছু ঠিকঠাক। রিহার্সাল শুরুর আগে ক্যানসার আক্রান্ত কাইঞ্জ মারা গেলেন। সোয়েইগ যদিও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন না, কিন্তু এই প্রিয় মানুষগুলির মৃত্যুতে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। মইসি ছিলেন আরেক জার্মান অভিনেতা, কাইঞ্জের যোগ্য উত্তরসুরি। তিনি এবার চাইলেন কাইঞ্জের ফেলে যাওয়া চরিত্রটিতে অভিনয় করতে। সোয়েইগ রাজি হলেন না। বহুদিন পর, মইসি আবার এলেন অন্য অনুরোধ নিয়ে। ভিয়েনার মঞ্চে পিরানদেল্লার নাটক হবে, মোইসি অভিনয় করবেন। পিরানদেল্লার শর্ত সোয়েইগ যেন জার্মান অনুবাদের দায়িত্ব নেন। সোয়েইগ রাজি হলেন। অনুবাদ সমাপ্ত করলেন। ১৯৩৫, মুসোলিনিও হাজির হবেন, ইতালী-অস্ট্রিয়ার বন্ধুত্বের রাজনীতি দীর্ঘজীবী হবে। এমন সময়।মোইসি মারা গেলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত হয়ে।

প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। প্রতিটি ভ্রমণ তাকে বদলে দিয়েছে। ভারত ভ্রমণের পর তার নিজের ভাষায়, "Many a detail that had formerly occupied me unduly seemed petty after my return, and I ceased to regard our Europe as the eternal axis of the universe." সোয়েইগের নিউ ইয়র্ক ভ্রমণের বৃত্তান্ত দারুণ। এর আগে গোর্কি, এক্সুপেরী, দালি আর পপারের আমেরিকা ভ্রমণ এর হালকা পাতলা অভিজ্ঞতা-বর্ণনা পড়া ছিল। সোয়েইগের ভাষায় তার আমেরিকা আসার কারণ, "I was one of the very few writers who went over not to earn money or to exploit America journalistically, but solely to compare a rather uncertain impression of the new continent with the reality." তখনকার ম্যানহাটন অত জাঁকজমক পূর্ন নয়, কিছু কিছু স্কাই-স্ক্র্যাপার দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু বেয়াড়া ভাবটা রয়ে গেছে, সিনেমা, বা আর্ট গ্যালারির পরিমাণ কম। প্রথম ঘোর কাটার পর সোয়েইগ, রাস্তার ধারের চাকরির বিজ্ঞাপন গুলি দেখতে শুরু করলেন, এবং খোঁজ নিতে লাগলেন। অচিরেই পাঁচটা চাকরির সন্ধান পেয়ে গেলেন, যার মাধ্যমে একজন নবাগত এই শহরে মাথা গোজার ঠাই নিশ্চিত করতে পারে। এই চাকরি সন্ধান কল্পে কেউ তার ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। সোয়েইগ জানলেন এই নতুন রাষ্ট্রটিকে, তথাকথিত ইউরোপিয়ান ঔদ্ধত্যের বাইরে গিয়ে।
স্তেফান সোয়েইগ তার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মনোভাব নিয়েও প্রথম মহাযুদ্ধ এড়াতে পারেন নি। কোনোমতে যুদ্ধকালীন দেশসেবা করেছেন লাইব্রেরিতে দায়িত্ব নিয়ে। এর মধ্যে একদিন দরজায় নক। বাইরে দেখেন রাইনার মারিয়া রিলকে, সৈন্যের পোষাকে। He looked too touchingly awkward, his collar too tight, disturbed by the thought that he had to salute every officer, clicking his heels together....For the first time he no longer looked young; ... "Abroad" he said "if one could only go abroad! War is always a prison". Then he left. এরই মাঝে খুঁজে পেলেন রল্যাকে। সেও এক কাকতাল। রল্যার জঁঁ ক্রিস্তফই যেন আধুনিক ইউরোপের নায়ক। প্রথম মহাযুদ্ধে যার পরাজয় প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছ থেকে। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, প্রথম যুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝের সময়টায়। ১৯৩৪ পর্যন্ত। রাইখস্ট্যাগ পোড়ানোর সময় সিনেমা হলে চলছিল, সোয়েইগের কাহিনীর তে তৈরি সিনেমা "দ্য বার্নিং সিক্রেট"! গোয়েবলস-হিটলারকে বেশ যন্ত্রণায়ই ফেলেছিলেন। আরো একবার স্ট্রসের সাথে অপেরা নিয়ে।
সোয়েইগ এর অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ, পক্ষপাত হীন, "One who aims to depict his time as honestly and clearly as possible must also have the courage to disappoint romantic conceptions!" ভিয়েনার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, বা রাশিয়ার বলশেভিক রাষ্ট্র, মুসোলিনির ফ্যসিস্ট ব্যাবস্থা বা চেম্বারলেইনের পররাষ্ট্র নীতি, এমনকি হিটলারের উত্থানকেও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন নির্মোহ ভাবে। দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে আশ্রয়হীন সোয়েইগ ব্রাজিলে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে একত্রে আত্মহত্যা করেছিলেন প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে। লেখক, তার নিজের দেশে, নিজের ভাষাভাষী মানুষের কাছে নিষিদ্ধ, বাঁচবেন কি উদ্দেশে?
একটা জায়গার বর্ণনা না দিয়ে পারছি না। জানি না, ভালো লাগবে কিনা। সোয়েইগ গিয়েছেন ইতালি সোরেন্টো, গোর্কির সাথে আছেন। তিনদিন ছিলেন। এর আগে রাশিয়া তে যখন গিয়েছেন, ট্রেন স্টেশনে বা অন্যত্র রাশিয়ান লোকজন, শসা বা মাংস বিক্রেতা, কৃষক এমনকি রাশিয়ান স্তেপ, সবই তার পরিচিত লেগেছিল, বুঝতে পেরেছিলেন দস্তয়েভস্কি, গোর্কি, তলস্তয়ের পড়ার প্রভাব। গোর্কিকে রাশিয়ান কৃষকের মতই দেখতে। তো সোরেন্টোকে একদল রাশিয়ান নাবিক এসেছে, বন্দরে নেমেই তারা খোঁজ নিতে শুরু করেছে, তাদের লেখক কই? সোরেন্টোর মূল্য ঐ নব উদ্যমী বিপ্লবী নাবিক সেনার কাছে ঐ। হই হই করে লেখকের বা বাড়ি খুঁজে নিয়ে নাবিকেরা হাজির। গোর্কি তাদের অভ্যর্থনা করলেন। এই আবেগী নাবিকের দল, লেখকের প্রতি তাদের অধিকারে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, "লেখক তুমি এই বুর্জোয়া ধরণের বাড়িতে কি কর? আমাদের সাথে চলো।" গোর্কি তখন স্বাস্থ্যগত কারণে সোরেন্টোতে। নাবিকদের প্রশ্ন কে বেশ প্রশ্রয় দিয়ে গ্রাম্য কৃষকের মতন মাথা নাড়িয়ে অপরাধবোধে ভুগছেন। আরো আরো অনেক অনেক ঘটনা। লন্ডনে ফ্রয়েডের শেষ দিনগুলি।

সব মিলে সোয়েইগ নিজে আছেন।

Friday, April 21, 2017

নয়া জল


নয়া জল, তোমারে কতদিন ধরে চিনি, উদ্বাস্তু
দুইজনে, আজন্মের সখা হে। আমার আয়েশী
মাচায়, তুমি মৌসুমী ব্যাবসা ফেঁদেছ, বন্ধকী।
তোমার বুদ্বুদের মায়ায়- চোখ গেল, গেলো
পাখি অভিমানে।

গায়ে-ধূলা মোছে নাই নব-বর্ষণে।

উত্তর থেকে ঢল আসে, ধানপঁচা পানিতে
ভেসে আসে সংক্রান্তির চাঁদ। আরো ভাসে
পৌষের পোনা, ভাসে মোর কবুতর ছানাটি,
নাও উল্টিয়ে তলিয়ে যাওয়া মায়োপিক চোখে।

Tuesday, March 07, 2017

মানুষের পৃথিবী



এক্সুপেরী পাইলট ছিলেন। যে যুগে উড়োজাহাজের চেয়ে জলের জাহাজ নিরাপদ বেশি ছিল সে যুগের পাইলট। ফরাসী। এই পরিচয় টাও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধারম্ভের পর আমেরিকা গিয়েছিলেন ফ্রান্সের পক্ষে যুদ্ধে রাজি করাতে। ইন্টারনেটে এইটুকু পাওয়া গেলোঃ

He was well enough connected to get Eisenhower, the Allied Supreme Commander, to intervene on his behalf. But at that moment General Charles de Gaulle made a speech implying that Saint Exupéry was a collaborator with the German-installed Vichy regime, largely because he had a war book (Flight to Arras) published in occupied France. De Gaulle had become convinced that the aristocratic author was turning the Americans against him. (St-Ex, for his part, refused publicly to support de Gaulle, telling friends that the general put political ambition above the good of France.)  

দ্য গলের পক্ষে মিছিলে বা সমাবেশ এড়িয়ে গেছেন। ফ্যসিজমের বিরোধী ছিলেন। এজন্য বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় নিজ চোখে দেখেছেন, মানুষের নৃশংসতা, অসহায়তা, আদর্শের বা যুক্তির অসারতা এবং সর্বোপরি সামাজিক মানুষ এবং তার সম্ভাবনা। বার্সেলোনা বনাম মাদ্রিদ ফ্রন্টে রাতের বেলা দুই দিকের শত্রু সেনাদের মধ্যে কথোপকথন শুনেছেন, পার্থক্য পান নি। কে কমিউনিস্ট-এনারকিস্ট আর কে ফ্যসিস্ট? 

ব্যাক্তিগত জীবনে সম্ভবত অসুখী। "হ্যাটের নিচে স্ত্রীর চোখ" গুলি সাহারার মরুভূমিতে হারিয়ে যাবার পর মনে পড়েছে; পিপাসায় ক্লান্ত হয়ে নিঃশেষ হবার আগ পর্যন্ত সেই চোখগুলি মনে করার চেষ্টা করে গেছেন। তবে এগুলি আমেরিকা যাবার আগ পর্যন্ত। বইটার সম্বন্ধে জেনেছিলাম, আন ম্যারি কে লেখা ওয়ালীউল্লাহর চিঠি থেকে। ওয়ালীউল্লাহর বক্তব্যের সাথে মিলে না, আমার মনে হয়েছে এক্সুপেরী অনেক বেশি আশাবাদী, জীবন নিয়ে। আমার বোঝার ভুলও হতে পারে। অনুবাদ পড়েছি। লিটল প্রিন্স এখনো পড়া হয় নি। হবেও না সহসা। বাংলা অনুবাদ পেয়েছিলাম একটা;  ভালো হয় নি মোটেও; ইংরেজিটা শুরু করেছিলাম, বাংলার চেয়ে অনেক ভালো। 

বইয়ের কথা বলা যাক কিছু। আখ্যান এক্সুপেরির বাস্তব অভিজ্ঞতার, কিন্তু এরই মধ্যে মানুষ, মানুষের পৃথিবীর বর্ণনা। সে পৃথিবীর মানচিত্র বা ভূগোল, তাতে আল্পস-সাহারা-আন্দিজ-পাটাগোনিয়া-দক্ষিণ আমেরিকার শেষ মাথায় অন্তরীপ ঘুরে যে শহর, সে পৃথিবীর মানুষের পেশা, পাইলট বা সরকারী কর্মচারী, দাস-ভৃত্য, দস্যু, মরুভূমির বেদুইন, তার "রাজিয়া", ফ্যাসিস্ট যাজক সম্প্রদায়, মানুষের হাতিয়ার, উড়োজাহাজ-রাইফেল- কিংবা মানুষের চরিত্র, যেমনটা

You, Bedouin of Libya who saved our lives, though you will dwell for ever in my memory yet I shall never be able to recapture your features. You are Humanity and your face comes into my mind simply as man incarnate. You, our beloved fellowman, did not know who we might be, and yet you recognized us without fail. And I, in my turn, shall recognize you in the faces of all mankind.

যেমনটা ফ্রন্টে যুধমান সৈন্যদের মধ্যে কথোপকথনে, মুক্তি পাওয়া দাস, বা বেনগাজীর বন্দরের মানুষগুলির মধ্যে, যা দেখেছেন গৃহযুদ্ধের বার্সেলোনা বা মাদ্রিদের মানুষগুলিরে মধ্যে "Human drama does not show itself on the surface of life. It is not played out in the visible world, but in the hearts of men." ।