Sunday, March 30, 2025

উত্তর আধুনিক ত্রাণ



এই মাস পাঁচেক
শামুকের জীবন প্রণালী গভীর ভাবে অনুসরণ করার পরও দেখছি কেউ জেতে নি
ঝিনাই-যমুনার কূল উপচে আসছে নুহ এর প্লাবন।

কোথাও কোনো কুটোর দেখাও নেই

পাঁচ কিলো হেটে অথবা
পাউবোর ভেসে যাওয়া বাঁধ সাঁতরে
যেতে পারলে পাওয়া যাবে
ভাত এর এডভেঞ্চার।

মরিচ বাতির সারি জ্বলবে
ত্রাণকর্তা আসবেন
চেয়ারে বসে শোনাবেন
রহস্য-রোমাঞ্চের কবিতা।

কোথাও কোনো অশ্রু জলও নেই

সবাইকে আবারো অবাক করতে গিয়ে
কর্তা নিজেই অবাক হয়ে দেখাবেন

পাথর যা জানে / রবার্ট ডানা

 আগুণ বললো

"মাংস। মাংস।"

জল বললো
"চুল।"

বাতাস বললো
গম ক্ষেতের দুয়েকটা পালকের কথা।

মাটি বললো
"ঘাম।"

ভেসে যাওয়া মেঘের ছায়ায় ঝলমল করে ওঠে
সুশোভিত ঘাস।

আমি আমার সন্তানকে বললাম
"যা কিছু তোমার
তাতে নিজের নাম লিখো।"

জায়ন পর্বতে ছাগলের খোঁজে এক আরব রাখাল

 

Yehuda Amichai ইয়েহুদা আমিচাই

জায়ন পর্বতে ছাগলের খোঁজে এক আরব রাখাল
ঠিক তার বিপরীত পাহাড়ে
আমি খুঁজি আমার ছোট্ট শিশুটিকে
একজন আরব রাখাল আর এক ইহুদী পিতা
দুজনের সাময়িক ব্যর্থতার বিরতিতে
দুজনের মধ্যকার উপত্যকায়
সুলতানের জলাশয়ের উপরে
দুজনের আর্তনাদ মিলেছে কোথাও গিয়ে
আমরা কেউই শিশুটিকে বা ছাগল ছানাটিকে
ফিরে পেতে চাই না
ধরা পড়ে "হাদ গাদয়া"র চক্রে।

কিছুক্ষণ পর শিশু আর ছাগল ছানা
খুঁজে পেলাম ঝোপের মাঝে
আমাদের আর্তনাদ আমাদেরই মাঝে ফিরে এলো
হাসি আর কান্না হয়ে।

এই সব পাহাড়ে ছাগল বা শিশুকে খুঁজতে গিয়েই
নতুন নতুন ধর্মের পত্তন হয়েছে।


***************
হাদ গাদয়া"র চক্র


একটি ছোট ছাগল ছানা,
একটি ছোট ছাগল ছানা

এর পর এলেন সবচেয়ে পাক যিনি
সকল প্রশংসা যার, আজরাইলকে তিনি
আঘাত করলেন, যে প্রাণ নিয়েছিলো তার
হত্যাকারী যে ষাঁড়টিকে মেরে ফেলেছিল আর
এই ষাঁড় যে জল খেয়ে করেছে নিঃশেষ
যে জল আগুনকে ফুরায়েছে বেশ
যে আগুন পুড়িয়েছে সেই লাঠিখানা
কুকুরকে পিটিয়েছে লাঠি তা জানো না!
সারমেয় দিয়েছিল বিড়ালে কামড়
এ বিড়াল খেয়েছিল ছোট্ট ছাগলছানা
এই ছাগল কিনেছিল বাবা
হাঁট থেকে লেগেছিল কড়ি দু আনা।

একটি ছোট ছাগল ছানা,
একটি ছোট ছাগল ছানা


পরিত্যাক্ত থিয়েটারে / মাহমুদ দারবিশ



বৈরুতের পরিত্যাক্ত থিয়েটারে
আমারও একটা আসন আছে
কখনো ভুলে যাই,
আবার চট করে শেষ অংকটা মনে পড়ে ...
এর কারণ একটাই
গোটা নাটকটাই লেখা হয়েছে দুর্বল হাতে...

সমগ্রটাই বিশৃঙ্খলা

যুদ্ধদিনের হতাশার মতো
দর্শকের প্রৈতিজাত এক
আত্মজীবনী। কুশীলবরা
সকলে চিত্রনাট্য ছিঁড়ে ফেলে
দর্শকের মধ্যে নাট্যকারের খোঁজ করছিল
আমরা যার যার আসনে বসে

পাশের শিল্পীকে আমি জিজ্ঞেস করলামঃ
তুমি না লিখে থাকলে অস্ত্র বের করো না, অপেক্ষা করো!
-না
সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি লিখেছ নাকি?
-না

আমরা বসে থাকলাম, মনে ভয়
বললাম, নিরপেক্ষ নায়কের ভূমিকায়
অবধারিত নিয়তি থেকে বাঁচা যেতে পারে
সে বলে, কোনও নায়ক দ্বিতীয় অংকে
সম্মানজনক মৃত্যুবরন করে না। বাকীটা
দেখতে চাই। হয়ত কোনো একটা অংক
একটু সংশোধন করে দেবো। হয়ত এই লৌহ বেড়ি
আমাদের ভাইদের যে দশা করেছে
তার কিছু হলেও লাঘব হবে।

আমি বললাম, তুমিই তাহলে লিখেছ?
সে উত্তর দিল, তুমি আর আমি
মুখোশধারী দুই নাট্যকার দুই দর্শক

আমি বললাম, না আমার কী আসে যায়?
আমি তো দর্শক শুধু

সে জানালো, খাদের কিনারায় কোন দর্শক নেই...
আর এখানে কেউই নিরপেক্ষ নয়
তোমাকে অবশ্যই নিজের জন্য চরিত্র নির্বাচন করতে হবে

বললাম, আমি শুরুটা হারিয়ে ফেলেছি, শুরুতে যেন কী ছিল?

Wednesday, February 05, 2025

এখানে রমণীগুলি নদীর মতন বা নিগ্রোর নদী কথন

মূলঃ ল্যাংস্টন হিউজেস
















তবে আমি এই নদীগুলোকে চিনি
পৃথিবীর মতন পুরাতন সব নদী
মানুষের শিরায় ধমনীতে বয়ে যাওয়া শোণিতধারার চেয়েও পুরাতন

নদীর মতন গভীর আত্মা বয়ে নিয়ে চলেছি

সেই তরুণ বেলায় ফোরাতের জলে নেমেছিলাম
তারপর কঙ্গোপাড়ের কুড়েতে দুদণ্ডে ঘুম এনে দিয়েছিলো
নীলের ভাটিতে গড়েছি পিরামিড,
শুনেছি মিসিসিপির গান, লিংকনের পদধ্বনি
নিউ অরলিয়েন্সের দিকে
তার পলিমাখা বুকে দেখেছি সোনালি সূর্যাস্ত

নদীরে চিনেছি আমি
পুরাতন, অন্ধকার নদী সব

আমার ভেতরটা নদীর গভীর খাতের মতন













Friday, January 24, 2025

সেলিম মোরশেদ এর কান্নাঘর














“কান্নাঘর”কে সেলিম মোরশেদের গল্প বা ফিকশন হিসেবেই পড়ি আমরা। একশন ধর্মী ফিকশন বলা যায়। একশনটা তৈরী হতে থাকে কর্তাভজা ভগবেনে সম্প্রদায় ও তার গুরু বিজয়মোহনকে ঘিরে। একটা একশন দৃশ্যের জন্য প্রয়োজনীয় রূপকল্প তৈরি হতে থাকে। একশন মানে একেবারে মারামারিই, তাও আবার আগ্নেয়াস্ত্র, রক্তারক্তি ব্যাপার আছে। বাস্তবে যেমন থাকে। কিন্তু ভগবেনেদের নিষেধ আছে। অমান্য করলে জরিমানা হয়।

গল্পের বর্ণনায় শুরুতে আমরা একটা নতুন পরিবেশকে চিনতে শুরু করি এই একটা প্রামান্যচিত্রের মতন করে। বেগুন, আলুর স্তুপ, গামলায়, এরপরে আবার বেগুন আলুর স্তুপ, গুরু বাড়ির এই সেবা আয়োজনের ভেতরে আমরা ঢুকে পড়ি এই পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে। এরপরে আরো একবার “প্রথম প্রহরে চিড়ে, টক দই ...”। গুরু বিজয় মোহন এর চোখের জলের মতই ঝরতে থাকে। এরপর সাংবাদিকরা, অতিথিরা চলে গেলে আমরাও বিজয় ঠাকুরের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারি। তার দুই চোখের জলের হদিস পাই।

“তরকারিতে যেমন গুরু মসলা নেই।” তেমনি সহজ জীবন, সহজিয়া ধর্ম, সহজ প্রশ্ন নিয়েই মানুষের কারবার। বাইরের মানুষের কাছে সেগুলি হয়ত সহজ হয়ে ধরা দেয় না। তাই এক জায়গায় পাওয়া যায় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের মানুষগুলিকে নিত্যানন্দ-সদানন্দ-বিজয়-যশোদা-আসমা-মাধুরী-মিল্লাত-দুই সাংবাদিক-ছটাকে মোশারফ-দেড় ব্যাটারি-শহীদ ড্রাইভার...। এই স্বল্প পরিসরেও প্রত্যেকটি চরিত্র স্ব স্ব ভূমিকা পালন করতে থাকে।

জলজ সন্তরণ, কান্নার জলে। সেই জলের তলে কী আছে? জলজ উদ্ভিদ, শেওলা, জলের মধ্যে মাছও আছে। সে মাছ সদা চঞ্চল। জীবনের কী সাধ্য তার দর্শন স্থির করে। এই জল থেকে উঁকি মেরে শ্বাস নেয়, আবার ডুব দেয় জীবনের জন্য। নাকি উল্টোটা। বাস্তবের সংঘাতে জলের ঘোর কিছুক্ষণের জন্যে কেটে যায়, সেখানেই গল্পের ক্লাইম্যাক্স। হয়ত এর পরে এখান থেকেই নতুন জলের আখ্যান, নতুন কান্নাঘরের উদ্বোধন হবে। আমরা সেই আশায় থাকি।



শ্রীচৈতন্য দেবের বৈষ্ণব আন্দোলন এক দিকে যেমন ভাবান্দোলনের সূচনা করেছিল, আরেকদিকে সামাজিক বিপ্লবেরও সূচনা করেছিল। এই গৌরচাঁদের বিদায়ের সাথে সাথেই তার উত্তরাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এক দিকে উচ্চ বৃন্দাবনবাদীরা, অপর দিকে নিত্যানন্দের অনুসারী দল। চৈতন্যদেবের জীবদ্দশাতেই শুধু যে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও বেদবর্জিত শুদ্র শ্রেনী হরিনামের ছোঁয়া পাচ্ছিল তা নয়, সহজিয়ারা বা তান্ত্রিকপন্থাও এই সামাজিক বিপ্লবে ব্রাহ্মণ্যবাদকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার যোগাড় করছিল। সেটা কতটুকু কী পরিমাণে সে বিবেচনা করা যাবে তুলাদন্ডে অন্য অবসরে। তবে চৈতন্য দেবের অন্তর্ধানের পর বৃন্দাবনবাদী অদ্বৈতাচার্যের প্রভাবে, রূপ-সনাতন প্রভৃতি গোস্বামীদের দ্বারা জরুরী ভিত্তিতে প্রচুর শাস্ত্র লিখিত হয়। বেদবর্জিতরা হয়ে ওঠেন শাস্ত্রবর্জিত। অন্যদিকে নিত্যানন্দের পুত্র বীরচন্দ্র বা বীরভদ্র হয়ে ওঠেন সহজিয়া বৈষ্ণবদের অবতার।


বীরচন্দ্ররূপে পুনঃ গৌরঅবতার
যে না দেখেছে গৌর সে দেখুক আবার


তারই প্রশ্রয়ে-আশ্রয়ে সহজিয়া-তান্ত্রিকেরা বৈষ্ণববাদের ছায়াতলে আসে, থেকে যায়। এই সহজিয়াদেরই এক শাখা গল্পের ভগবেনে সম্প্রদায়। গল্পের মধ্যেই আমরা দেখি, বিজয় মোহন কালের হিসেব ফেঁদেছেন, ঠিক ক্লাইম্যাক্সের আগে দিয়ে, গোরাচাঁদ থেকে আউলচাঁদ। আউলচাঁদ থেকেই কর্তাভজারা। ভক্ত ও গুরু, গুরু ও ভক্ত, গুরুভক্ত মিলে কালের আবর্তনে গড়িয়ে চলে, গুরু ছাড়া ভক্ত হয় না, ভক্ত ছাড়া গুরু হয় না।


ভক্ত আমার মাতাপিতা
ভক্ত আমার গুরু
ভক্তরে রেখেছে নাম বাঞ্ছা কল্পতরু।


বিজয়মোহন রোমন্থন করছেন, যুগান্তরের সেই প্রবাহকেই, সেই মহাবীর থেকে বুদ্ধ, রামানন্দ হয়ে কবীর, তার থেকে চৈতন্য, চৈতন্য হতে আউলচাঁদ। বিজয়মোহন নিজেকে এই যুগাবতারদের ধারাতেই আবিষ্কার করছেন। কিন্তু আবিষ্কার করেই আঁতকে উঠছেন নিজেকে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে। এখানে দুর্বল বিজয়মোহনকে আবিষ্কার করি আমরা। যুগ-প্রশ্নের সমাধানে যে গুরু ব্যর্থ হতে যাচ্ছেন, এমন আলামত পাই।


কান্নাঘরের ক্লাইম্যাক্সও কিন্তু এই ধারাতেই পাওয়া যাচ্ছে। বিজয়মোহনের পরে কে? তার ডান আর বাম চোখে দুই ধারা, তার অনুজ সদানন্দ ও নিত্যানন্দ। যুগের প্রশ্ন সমাধানে বা জিজ্ঞাসায় কি বিজয়মোহন ব্যর্থ হচ্ছেন? তন্ত্র মন্ত্র এসে কি সহজ মানুষের চোখের জল ঘোলাটে করে দিয়ে যাচ্ছে? গুরু কে? গুরু ব্যর্থ হন কীভাবে? গুরুর তৈয়ার নিয়ম নীতি জীবনপথ এগুলির দ্বারা সংসার চলতে থাকলে চিরন্তন ভাবে, চোখের জলের ধারার মতন, তাহলে আর বাঁধা কোথায়? বাধা আসবেই। বাঁধা আসে স্বাভাবিকভাবে, বাস্তবের বিবর্তনে, আর জলের বাধন তাতে টুটবেই, তাহলে ডানে নাকি বায়ে, কোন দিকে যেতে হবে? জলজ কান্না নাকি শুষ্ক কান্না। সেলিম মোরশেদের এই গল্পটির ঢং টা প্রামান্য ধরণের। সমাধানটা ক্লাইম্যাক্সে স্পষ্ট করে গেছেন। যেন গোটা ভগবেনে সম্প্রদায় দাঁড়িয়ে আছে, ছিল এই যুগসন্ধিক্ষনে, এই সমাধানের অপেক্ষায় আর লেখক আমাদেরকে নিয়ে দাড় করিয়েছেন বিজয়মোহনের উঠোনে, তার কান্নাঘরের সামনে।



গল্পের বর্ণনা প্রামাণ্যধর্মী। পথ দেখিয়ে সাংবাদিক ও অন্যান্য অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হয় উঠোনের সামিয়ানার নিচে। ভক্তরাও আছেন, কিন্তু নেপথ্যে, সচল-সজীব বাঞ্ছা-কল্পতরু হয়ে। এক ও অনেকের মধ্যে থেকে লেখক বের করে আনেন সামিয়ানার তল থেকে, নিয়ে যান স্কুলের পাশের চায়ের দোকানে। ছটাকে মোশাররফ আর দেড় ব্যাটারিকে হাজির করেন, এন্টি ম্যাটার। আবার ফিরিয়ে নিয়ে যান উঠোনে। আমরা পাঠকেরা অপেক্ষা করতে থাকি, উঠোনে কখন এন্টি ম্যাটার এসে হাজির হয় তার ক্লাইম্যাক্স নিয়ে।

বিজয়মোহনের কান্নাঘর, ভক্তদের নিয়ে তার সংসার, সে সংসারের আইন। সহজ প্রশ্নে, সহজ মানুষের সহজিয়া তরিকা। আসলেই কি সহজ! এই কান্নার মধ্যেই অতীত, আর ভবিতব্যের ধারা বহমান। সদানন্দের কান্না যেখানে মিলে যায়। সদানন্দ সেই কান্নার আর্দ্রধারা। বিজয়মোহন যাকে উত্তরসুরি হিসেবে মনে মনে নির্বাচন করে রেখেছেন। সেলিম মোরশেদ কিন্তু সদানন্দের স্বরূপের সন্ধান দিয়েছেন। জলজ উদ্ভিদ, সন্তরণশীল মাছের মুখগহ্বরে আসা যাওয়া করে প্রতিক্ষণ, কান্নার জল যতক্ষণ তাকে ধারণ করে, এর বাইরেও, বাস্তবেও। প্রশ্ন জাগে এই মীন সন্তরণে কাদা হয় না? জল ঘোলা হয়ে যায় না তখন?


আর শুষ্ক ধারাটির নাম নিত্যানন্দ। সেও কান্নার অংশ। কিন্তু বাস্তবতা তাকে প্রকাশ্যে কাঁদতে দেয় না। আড়াল খুজতে সে শহরে যায়, হোটেলে গিয়ে ওঠে, কিন্তু তবুও কাঁদার অবকাশ পায় না। ফিরে আসে বাস্তব থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে। ভগবেনে প্রান্তিক সম্প্রদায়। তাদের বিশ্বাস সহজিয়া দর্শনের মতন সহজিয়া জীবন ধারণ প্রক্রিয়ার ফলে তাদের রোগবালাই হয় না। এমনই অনেক আইন রয়ে গেছে কর্তাভজাদের সংসারে। আছে বিধিনিষেধ, চুরি, এঁটো, ছেনালি, মদ, মাংস, মিথ্যা ও রক্তারক্তি। বৈদ্য ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাবে না, রেস্টুরেন্টে খাওয়া যাবে না। বাস্তব ধর্মগুলির আইন যেমন হয় আর কি! সে আইন অমান্য করলে আছে জরিমানা, পাপ-পূন্য এবং তার অধিক হিসাবের ধারাপাত। প্রত্যাখ্যাত নিত্যানন্দ সেখানেও সহজ প্রশ্নের উত্তর খোঁজ করে। এ জন্যেই বোধহয় অশ্রুহীন কাঁদতে হয় তাকে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর না মিলিয়ে সে কাঁদতে পারে না। সেও প্রতি মুহুর্তে কম্পমান সেই জলজ শৈবালের মতনই। কান্নাঘরের সেও এক অনিবার্য অশ্রু।


কান্নাঘরের সংকটটিকে সেলিম মোরশেদ একটা আপাত সমাধানের দিকে নিয়ে যান বলে মনে হতে পারে। ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে খেয়াল করি, ভক্তরা তাকিয়ে আছেন, গুরুবদল এর পালা শুরু হচ্ছে। পাঠকের জায়গা থেকে দেখলে আমরাও এই পরিণতিকামী সমাধানের দিকেই যেতে চাই। কিন্তু ভগবেনে সম্প্রদায়টির ভাগ্যে কি ঘটে আমরা আর জানতে পারি না। প্রান্তিক ভক্তগুরু সম্প্রদায়ের ফিকশন ফেলে আমরা আমাদের নন ফিকশন জীবনের বাস্তবতায় ফিরি, কান্নাঘর গল্পটির অবসানে। কিন্তু কান্না চলতে থাকে।





Sunday, January 12, 2025

অপসারী





১৭ই জুলাই, সকাল


আজকে আশুরা। ক্যাম্পের ওদিকে গেলে হয়ত আরও ভালোভাবে টের পাওয়া যেত। এইবারও কি অন্যবারের মতো আশুরার মিছিল হবে? সকালের নাস্তা করতে একটু দেরি হলো। রুটি আর ডিম ভাঁজি। কালশি রোডের এই ফ্ল্যাটটা একটু বড়।কিচেনটা ঠিকঠাক। ফিল্টার মেশিন থেকে গ্লাসে পানি নিতে নিতে রাকিবুল এর চিন্তা এলো বাসায় ফোন দিতে হবে। ছুটির দিনগুলিতে বাসায় সবাইকে এক সাথে পাওয়া যাবে। 


"হ্যালো, তোমরা কেমন আছো?"

"নাস্তা করছি।"

 

কথা বলতে বলতে ওয়াশিং মেশিন টা চালিয়ে দিল। এই বাসায় আম্মা-আব্বাকে আনা যাবে। ঝিনাইদাতে বড় ভাই থাকাতে অবশ্য আরাম পান, কিন্তু ঢাকায় এলে আম্মার চিকিৎসার ভালো সুবিধা হতো। 


"আম্মা ওষুধ খাইছেন?"

"অফিসে যাই কেমনে? কেন বাইকে করে।"

"তাড়াতাড়ি কি অফিস থেকে আসা যায় আম্মা? না আম্মা।"

"কী যে বলেন আম্মা! কাজ থাকে না?"   

"আচ্ছা চেষ্টা করবো।"

"রাফসান কি করে?" 


রাফসান ইকবালের ছেলে। রাকিবুলের বড় ভাই ইকবাল। ঝিনাইদায় সোনালি ব্যাংকে চাকরি করে। ঢাকার বাসাটা অনেকখানি গুছিয়ে এনেছে রাকিবুল। আব্বা বিমান বাহিনী থেকে রিটায়ার করার পর থেকে ঝিনাইদাতেই থাকেন।


"না আব্বা, আমি কোনো মিটিং-মিছিলে যাই না।"

"না না, আমাদের ওখানে তেমন কিছু নেই।"

"কথা হইছে এমআইএসটির জুনিয়রদের সাথে, অত ঝামেলা হয় নি।"     

"হ্যাঁ বলবো পিয়াসকে।"


পিয়াস রাকিবুলের বন্ধু। ওকেও একটা ফোন দেয়া যায়, আজকে দেখা করা যায় একটু। মোটর সাইকেলটার সাইলেন্সারটাও ঠিক করতে হবে। ওর পরিচিত একটা গ্যারেজ আছে বলেছিল, দশ নম্বরের দিকে।



১৯ শে জুলাই, সন্ধ্যা


গতকাল থেকেই মন ভালো নেই হাফিজা খাতুনের। গতকাল সারাদিন বাড্ডা আর বনশ্রীতে দারুণ গোলাগুলি। সন্ধ্যায় দশ নম্বরে নাকি আগুন দিয়েছে, কাজিপাড়াতেও, পুলিশ সারাদিন গোলাগুলি করেছে, হেলিকপ্টার থেকে নাকি গুলি করছে। এগুলি কেমন ধরণের কথা! কালকে রাত থেকে ইন্টারনেট নেই, ফোনের নেটওয়ার্ক ভালো না। কতগুলি মানুষ মারা গেলো কে জানে।জুমার পর থেকে নাকি আরও বেড়েছে গোলমাল।ছেলেটাকে ফোন দেয়া দরকার। 


"হ্যালো, তুমি কোথায়?"

"বাসা থেকে বের হইয়ো না।" 

"ঢাকার অবস্থা কেমন?"

"তোমার আব্বার সাথে কথা বলবা?"



হাফিজা খাতুনের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক। বিমান বাহিনীতে ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। দুই ছেলে। ইকবাল ব্যাংকার। ছোটটা ইঞ্জিনিয়ার। স্ত্রী আছেন, নাতি আছে। নাতি এসেছে চাচার সাথে কথা বলতে। 


"ছোট বাবা, ছোট বাবা।" 

"তুমি চলে আসো।"

"মোটর সাইকেল করে চলে আসবা।"

"গাড়ী চলে না?" 

"তাহলে এম্বুলেন্সে করে চলে আসবা।"


আবু বকর বুঝতে পারছেন ঢাকার অবস্থা ভালো না। মঙ্গলবারে রংপুরে বেগম রোকেয়ার একটা ছেলে মারা গেলো। সারা দেশে আরও কতজন। পরের দিন ছুটি বলে রক্ষা ছিল। ভেবেছিলেন বৃহস্পতিবার থেকে হয়ত আন্দোলন একটু কমে যাবে। মনে হচ্ছে এইবার বেশ সময় লাগবে সব ঠাণ্ডা হতে। রাতে কারফিউ দেয়ার সম্ভাবনা আছে। 


কিছু ক্ষণ পর। 


ছেলের কাছে ঢাকার অবস্থা ভালো নেই শোনার পর থেকে হাফিজা খাতুনের প্রাণটা ছটফট করছিল। ছেলে কোনো রাজনীতি বা অন্য কোনোকিছুর সাথে নেই। দুই ছেলেই এখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত। বড়টা ব্যাংকে। ছোটোটা ইঞ্জিনিয়ার। একটা চাকরি পেয়েছে। বিসিএস এর জন্য পড়ছে। বড় ফ্ল্যাট নিয়েছে। হাফিজা খাতুন কিছুতেই আশ্বস্ত হন না। স্বামীর কাছ থেকে আবার ফোনটা নিলেন।


"এই রাতে গ্যারেজে কেন?"

"দশ নম্বরে কি করো?" 

"তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরত যাও।"

"রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।"

"হ্যাঁ সাড়ে নয়টার মধ্যেই।" 

"তোমার আব্বা এশার নামাজ পইড়া আবার ফোন দিবেন।"  


বিয়েটা করিয়ে ফেলতে হবে। হাফিজা খাতুন বুঝে পান না ছেলে কি তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বললো কিনা যে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু উনি জানেন, ছেলে খুব শান্ত স্বভাবের।কোটা আন্দোলনের কোনো মিছিলে-মিটিং এ যায় না। তবু মন মানে না। কী একটা বাজতে থাকে মনের মধ্যে। এমন না তো, যে ছেলে আন্দোলনে যায়। আর মিছিল থেকে দূরে এসে এসে আমাদেরকে ফোন করে যাতে আমরা টের না পাই? আঠারো তারিখে মুগ্ধ নামের একটা ছেলে মারা গেছে, বিইউপিতে পড়তো, রাকিবদের এমআইএসটির পাশেই তো। ফ্রিজটা খোলেন হাফিজা খাতুন। নারকেল, গুড়, পুলি পিঠার পুরের সরঞ্জাম। রাকিবের পছন্দের। নাতিটা কি করছে দেখতে যান। 



২০ শে জুলাই, সকাল


"জ্বি, পিয়াস ভাই।"

"দুপুরের মধ্যে ঝিনাইদা পৌঁছে যাব।"

"কারফিউ কেমন ঢাকায়?"

"না সমস্যা হয় নাই। সালমানরে ঠিকানাটা পাঠাইছেন। হ্যাঁ, ইকবাল ভাই এর সাথে কথা হইছে।"

"উনার আম্মা বার বার সেনস হারাই ফেলতেছেন।"

"ঠিক আছে ভাই, আপডেট জানাতে থাকবো।"


ফয়সাল। রাকিবের সহকর্মী। এম্বুলেন্সে, সাথে সালমান, আরেক সহকর্মী। এম্বুলেন্সে রাকিবের লাশ। গত রাতে ১১ টার দিকে রাকিবের ফোন থেকে হাফিজা খাতুনের কাছে আরেকটা ফোন গিয়েছিল। কথা বলেছিল পিয়াস, মৃত্যু  সংবাদ জানাতে। একজন মহিলা রাস্তা পার হয়ে রাকিবুলের সামনে এসে পড়ে যায়, রাকিবুল মহিলাকে তুলতে গেলেই গুলিটা লাগে এসে। 


পিয়াসই লাশ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। সালমানের মোবাইল থেকে ঠিকানাটা পড়লো ফয়সাল। মহিষাকুণ্ডু, সার্কিট হাউজ রোড, ঝিনাইদা। 



২৮ শে জুলাই, কোনো এক সময়    


"জ্বি আমি ইকবাল"

"দাফন করা হয়েছে ২০ তারিখ দুপুরে, পারিবারিক কবরস্থানে।"

"আমাদের গ্রামের বাড়ি। গ্রাম বাসুদেবপুর, হরিণাকুন্ডু উপজেলা।" 


ইকবাল, রাকিবুলের ভাই। একজন সাংবাদিক ফোন করেছেন। বেশ কয়েকটা পত্রিকার সাংবাদিক কথা বলেছেন। একটু ভয়ে ভয়েই আছেন সবাই। ভাই যে আন্দোলন এ ছিল না, সে কথা প্রশাসনকে বোঝাবে কে! এখনো পর্যন্ত কেউ যোগাযোগ করেনি অবশ্য। 


"১৯ তারিখ রাতে।"

"মিরপুর ১০ আর ১১ মেট্রো স্টেশনের মাঝের এলাকায়।"


ইকবাল সেদিন একটা কথা হয়ত বলেন নি সাংবাদিকদেরকে। বা সাংবাদিকেরাও হয়ত তখন লিখেন নি।  


"আমার ভাই আন্দোলনে ছিল, আমরা বুঝতে পারি নি।"



*****


তথ্যসূত্র: প্রথম আলো

প্রকাশের তারিখ: ২৮ জুলাই, ২০২৪

ভার্সন: অনলাইন (https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/r58r8gagqm) 


*****


#RememberingOurHeroes

#JulyMassacre