Friday, June 24, 2011

তিনতলার উপর থেকে কথোপকথন

[অনুবাদ গল্প]

এই নিয়ে
দ্বিতীয়বারের মত আসা হলো এ জায়গাটায়। ঘোড়ার উপর বসা পুলিশটা তাকিয়েছিল তার দিকে
, বিস্ফারিত নেত্রে।

দুপুর বেলা। রাস্তার এক পাশে হলুদ রঙ করা দেয়াল। দেয়ালের ওপাশে বিশাল একটা তিনতলা আয়তাকার দালান। একই রকমের জানালাগুলি যেন ছোট ছোট অন্ধকার ফুটো। পুলিশটা প্রথমে তাকালো জানলায় লোকটার দিকে। আরেকবার মেয়েটার দিকে। জিনের উপরের বাঁকানো অংশে দুই হাত রেখে চোখদুটি বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ পর ঘোড়াটা নড়েচড়ে উঠলো নিজে থেকেই। রাস্তার মাঝামাঝি দাঁড়িয়েছিল, এক মুহুর্ত পরে অর্ধেক ঘুরে ঠিক রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে গেলো।

মেয়েটা দু’পা সামনে এগিয়ে গেলো। সামনের পা দুটো বাঁকিয়ে ধীরে ধীরে নীচু হয়ে গেলো ঘোড়াটা।

সার্জেন্ট! দয়া করে আমাকে তার সাথে দুটো কথা বলতে দিন।”

চোঁখ বোজাই ছিল। হাতদুটি জিনের উপর একই জায়গায় স্থির।

দেয়ালের উপর একটা কাটাওয়ালা বেড়া, যার শেষ মাথায় একটা কাঠের মিনার। ওর মধ্যে এক সান্ত্রী।

মেয়েটা আরেক পা এগিয়ে গেল

দেখুন, ওকে তো বদলি করা হচ্ছে...”

সূর্যটা মাথার উপর থেকে সরে গেছে। তারপরও গরম কমে নি। ছায়া পড়ছে দেয়ালের নিচের দিকের প্লাস্টার পর্যন্ত।

মেয়েটা বাচ্চাটাকে তার কাধে সরিয়ে নিল।

আবার তাকালো পুলিশটার দিকে, এবার চোখে পড়ল কপালের ঘামের চিহ্ন।

ঘোড়াটার সামনে থেকে সরে এসে দেয়ালের পাশ ধরে হাটতে লাগলো প্রায় কোন শব্দ না করে। অর্ধেকটা হাটার পর, দালানের বিপরীতে যেখানে পাথরের স্তূপটা, তার উপর গিয়ে বসলো।

ধুঁয়ে শুকোতে দেয়া বন্দীদের কাপড়গুলি দেখা যায় জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে। বেশির ভাগ একচুলও নড়ে না, মাঝে মাঝে বাতাস বয়, তাতেও না।

মেয়েটা নিজে থেকেই বলে উঠলো, ওগুলি নিশ্চয়ই ভেজা।”

বাচ্চাটাকে কোলে নিল। কিছুক্ষণের জন্য চোখ গেলো জেলাবার দিকে। বাতাসে দোল কাচ্ছিল। পা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে তাকিয়ে দেখলো পায়ের আঙুলগুলির দিকে, তাতে জড়িয়ে থাকা কাঁদা চোখে পড়লো। দুই পা একত্র করে ঘষে মাটি দূর করতে চেষ্টা করলো, এর পর আরেকবার তাকিয়ে দেখলো।

মাথাটা পিছনের দিকে নিয়ে তাকালো উপরের তিনতলার জানালার দিকে।

মিনারের ভিতর সান্ত্রীটা এক পা এগিয়ে কাঠের দেয়ালের উপর ভর করে মাথাটাকে আরাম দিচ্ছে।

তাকিয়ে দেখতে লাগলো আকশটাকে, আরেকবার বাড়িগুলির ছাদ-রাস্তার দিকে এর পর ঘোড়াটার মাথাটা।

হঠাৎ কারো ডাকাডাকিতে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হলো। পা গুটিয়ে এনে মেয়েটা দেখলো তিনতলার জানালার উপর থেকে একটা নগ্ন বাহু ইশারা করছে।

আজিজা। আজিজা, আমি আসোর।”

দেয়ালের দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে নিরবে তাকালো জানালার দিকে।

আমি আসোর, আজিজা, আসোর।”

লোকটার আরেকটা হাত বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো জানালা দিয়ে। দুই হাতের মাঝখানে কিছু একটা খুঁজতে থাকলো মেয়েটা। গরাদের ফাঁকে চাপা পড়া মুখটা চোখে পড়লো। তার পাশে-উপরে আরো কতগুলি মাথা।

আজিজা! আমার বদলি হয়েছে। আমার চিঠি পেয়েছিলে? চারদিনের মধ্যে আমাকে সরানো হবে। খেজুর গাছ দুটা ছাটানোর ব্যবস্থা করেছো? হামিদ আর সানিয়া কোথায়? সঙ্গে আনো নি কেন? আমার বদলি হয়েছে। হামিদ কোথায়?”

হঠাৎ পিছিন ফিরে চিৎকার করে উঠলো লোকটাঃ

চুপ কর বেজন্মার দল!” মেয়েটা তাকে চেচাতে শুনলো। জানালার মাথাগুলি উধাও হতে দেখলো। কিছুক্ষণ পরে তার মুখটা আবার দেখা গেলো গরাদের ফাঁকে। অন্য মাথাগুলিও এর উপর দেখা যেতে লাগলো।

আজিজা!”

মেয়েটা একবার তাকালো ঘোড়ার উপর বসা পুলিশটার দিকে, আরেকবার মিনারের ভিতর সান্ত্রীটার দিকে।

কাকে ধরে রেখেছো? শাকির? আজিজা!” মেয়েটা দুইবার মাথা নাড়ালো।

তুলে ধরো, উপরে তুলে ধরো।”

বাচ্চাটাকে দুই হাতে ধরে মাথার উপরে উঠিয়ে দিল। দেখতে পেলো হাত দুটো ভিতরে গুটিয়ে নিচ্ছে লোকটা। গরাদ ধরে আছে। তার মুখটা অদৃশ্য হলো। কিছুক্ষণের জন্য নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা চেহারাগুলির মধ্যে মেয়েটা খুঁজলো লোকটাকে। হাত দুটো কিছুটা নামিয়ে আনলো। জানালাগুলি থেকে হাস্যরোল শুনতে পাওয়া গেলো। আবার তার হাতদুটো দেখা গেলো। তার মুখটা ভেসে উঠলো মাঝখানে, স্পষ্টভাবে।

উপরে আজিজা, উপরে। সূর্যের দিকে মুখ করাও, যাতে আমি ওকে দেখতে পাই।” কিছুক্ষণের জন্য হাতদুটো নামিয়ে আনলো। এর পর বাচ্চাটাকে আবার তুলে ধরলো, সূর্যের দিকে মুখ করে। চোখ বন্ধ করে কান্না জুড়ে দিল বাচ্চাটা।

ও কাঁদছে।” লোকটা হাসতে হাসতে মাথা পিছনে ঘোরালো।

ছেলেটা কাঁদছে। বাচ্চাটা। আজিজা, ওকে কাঁদাতে থাকো।”

হাত দুটোকে মুখের কাছে এনে কোণকের মতো করে, চেঁচিয়ে বলে উঠলো, “ও কাঁদতে থাকুক।”

আবার হাসলো লোকটা। তার আশে পাশেও কয়েকটা চিৎকার শোনা গেলো। মেয়েটা তাদের কথা ও চিৎকার শুনতে পাচ্ছিল। তার পর আবার গরাদের ভিতর তার লম্বা নাকটা দেখতে পেলো।

শোন! আর বোকামির দরকার নেই। যথেষ্ট হয়েছে। ছেলেটাকে ঢেকে দাও, নয়ত রোদে পুড়ে যাবে।”

ছেলেটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো, মিনারের ভিতর সান্ত্রীটাকে সরে যেতে দেখলো।

খেজুর গাছ দুটো ছাটানোর ব্যবস্থা করেছিলে?” সে মাথা নাড়ালো।

করো নি কেন? কথা বলো না কেন? আমার বদলি হয়েছে। আবু ইসমাইলের সাথে দেখা করে যেও আর আমার ধন্যবাদ জানিও। সে খেজুর গাছ দুটো ছাটাই করে দেবে, তাহলে তুমি কিছু খেজুরও আনতে পারবে সাথে করে। সিগারেট এনেছো?”

সে হাত দিয়ে ইশারা করলো।

কথা বলো। তুমি কি বলছো?”

তুমি তো পেয়েছো।”

আরো জোরে।”

তুমি তো পেয়েছো, আমি পাঠিয়েছি।”

কখন?”

এই মাত্র।”

এই মাত্র! দাঁড়াও, যেওনা।”

হঠাৎ সে অদৃশ্য হলো। দুটো মুখ তখনো রয়ে গেছে জানালায়। একজন হাত বের করে অশ্লীল ভঙ্গি করলো। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলো, ফেরত গেল পাথরের স্তূপের দিকে।

আজিজা!”

গলার স্বর চিনতে না পারলেও জানালার দিকে তাকালো একবার। দেখলো লোকটা হাসছে। হাত আগের ভঙ্গিই করে আছে। দ্বিতীয় ব্যাক্তি হাটু গেড়ে বসেছিল। জেলাবাটা হাটুর উপর পর্যন্ত গোটানো। শুনতে পেলো সে ডাকছে!

আজিজা! দেখ!”

মেয়েটা একটু হাসলো। পুলিশটা তখনো ঘোড়ার উপর বসে, প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে। মিনারের জানালা দিয়ে সান্ত্রীটার মাথার একাংশ দেখা যাচ্ছে। শিরোস্ত্রাণ খুলে রাখা।

সে শুনতে পেলো অনেকগুলি গলার আওয়াজ তাকে ডাকছে। সে মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, দৃষ্টি স্থির সান্ত্রীটার দিকে, জানালা দিয়ে তার মাথা নাড়ানো দেখা যাচ্ছিল। ডাকগুলির পুনরাবৃত্তি হতে থাকলো, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, খিস্তিযুক্ত। সান্ত্রীটা শিরোস্ত্রাণ পড়ে নিল, মিনারের ভিতরেই।

হঠাৎ মিলিয়ে গেলো আওয়াজগুলি এবং কিছুক্ষণের মধ্যে তার স্বামীর উত্তেজিত কন্ঠস্বর শুনতে পেল, আজিজা!”

আমি বলেছিলাম পাঁচটা- পাঁচ প্যাকেট বলি নি?” নীরবে স্বামীর দিকে তাকালো সে।

তিন প্যাকেটে কি হবে?” স্বামীর দিকে হাত ইশারা করলো।

কি বলছো?”

পাঁচটা – আমি পাঁচটা পাঠিয়েছি।”

পাঁচ?”

সে ক্রোধে চেঁচিয়ে উঠলো, বেজন্মার দল।”

হঠাৎ অদৃশ্য হলো, আবার ঝুঁকে চেচিয়ে বলে উঠলো, অপেক্ষা কর, যেও না।”

মিনারের জানালার দিকে মুখ ঘোরালো মেয়েটা। একমুহুর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে আবার ফিরে এলো তার স্বামী।

ঠিক আছে, আজিজা। কিছু মনে করো না। পাঁচটা-হ্যা, পাঁচটাই ছিলো। ইছু মনে করো না, দুটা নিয়ে নিয়েছে – ব্যাপার না। শোন – আমি যেন কি বলছিলাম?” নীরবতা। সে দেখলো তার স্বামী জানালা থেকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে। কালো জেলাবাটা ঝেড়ে নিয়ে ফিরে গেলো দেয়ালের কাছে, লোকটা হাসলো।

আজিজা, আমি তোমাকে কিছু একটা বলবো ভাবছিলাম।”

আবার নীরবতা। সে তার মুখ ফিরিয়ে নিল, সূর্যের বিপরীতে। মুখের উপর পর্দাটা কিছুটা সরিয়ে নিল।

ওরা দুই প্যাকেট মেরে দিয়েছে, কিছু মনে করো না, আজিজা, কিছু মনে করো না।”

সে হাসলো। তার কন্ঠস্বর আবার শান্ত হয়ে এলো। উপরের অন্য মাথাগুলি উধাও হয়ে গেলো, শুধু পাশে একজনকে দেখা যাচ্ছিল।

দেয়ালটা গড়িয়ে ছিলে?”

এখনো না।”

না কেন?”

চাচাজান ভাটা চালু করলে, উনার কাছ থেকে ইট নিয়ে আসবো।”

ঠিক আছে, ট্রামে সাবধানে যেও। ছেলেটার দিকে খেয়াল রেখো।”

সে দাঁড়িয়েই থাকলো।

আর কিছু লাগবে?”

না।”

তাকিয়ে দেখলো লোকটার চেহারার দিকে, লম্বা নাক, নগ্ন বাহুদ্বয়। একটু হাসলো। পাশের লোকটা সেই হাসি ফেরত দিল।

হঠাৎ লোকটা আবার চেঁচিয়ে উঠলো, চিঠি পেয়েছিলে? আমার বদলি হচ্ছে।”

কোথায়?”

জানি না।”

কবে?”

শুনেছো, এরা এই জেল ভেঙ্গে ফেলছে।”

কোথায় যাবে তুমি?”

আল্লাহ জানেন – কোথাও হবে। কেউই জানে না।”

কবে?”

দুই তিন দিনের মধ্যে। এখানে আর এসো না। আমি বদলি হবার পর তোমাকে জানাবো। ছেলেটা কি ঘুমালো?”

না। জেগে আছে।”

এক মুহুর্ত মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলো নীরবে।

আজিজা!”

আবার নীরবতা। তার পাশের লোকটা একটু হাসলো। এর পর জানালা থেকে সরে গিয়ে ভেতরে উধাও হলো। তার স্বামী নীরব। গরাদের দুপাশে দুই হাত।

হঠাৎ সে পিছিয়ে গেলো, হাত গুটিয়ে নিল। তাকে চলে যাবার ইশারা করে জানালা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

মেয়েটা একটু একটু করে পিছু হটে গেল, যদিও তাকিয়ে ছিলো জানালার দিকেই।

কিছুক্ষণ পর বসে পড়লো পাথরের স্তূপটার উপর। পা দুটো ছড়িয়ে দিল, স্তন বের করে বাচ্চাকে খাওয়াতে লাগলো।

ছায়াটা এতক্ষণে রাস্তার মাঝামাঝি এসে পড়েছিল। প্রায় তার পায়ের কাছাকাছি। পা টা একটু পিছিয়ে নিল। আবার নীরব হয়ে গেলো জায়গাটা, শুকোতে দেয়া কাপড়গুলি মৃদুমন্দ বাতাসে দোল খাচ্ছিল এবার।

আবার পায়ের দিকে তাকালো, ছায়াটা এখন পায়ের পাতা ঢেকে দিচ্ছে। উঠে দাড়ালো।

সান্ত্রীটা তখনো মিনারের ভিতর। কাঠের পাটাতনের ফাঁক দিয়ে তার জুতার সামনের দিকটা দেখা যাচ্ছিল। ঘোড়াটার সামনে পৌছানোর ঠিক আগ দিয় এসে একবার পিছন ফিরে তাকালো। শূণ্য জানালা।

সন্তর্পনে পুলিশটার দিকে তাকালোঃ চোখ তখনও বন্ধ, হাত ঘোড়ার জিনের উপরের বর্তুলাকার অংশে। ঘোড়াটা নিশ্চল।

চিকন গলিটা ধরে বড় রাস্তার দিকে হেটে যেতে থাকলো।

1 comment:

BEE IT said...

খুবই সুন্দর গল্প। পড়ে ভালো লাগল।